মুক্তির সড়কে জনদুর্ভোগের মহানগরী ঢাকা

গতবছর জুলাই আন্দোলনের পর আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম এক নতুন বাংলাদেশের, যেখানে প্রতিটি খাতে আসবে যুগান্তকারী কিছু সংস্কার। ঢাকা নগরবাসীদের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার এই নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবে। অবকাঠামোগত উন্নতি না হলেও, আইন প্রয়োগে আসবে গতি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্য বলছে—যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে এর ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে প্রতিবছর ৩টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

প্রতিদিনের মতো আজও সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে মিরপুর ১০ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে দেখা গেলো সেই একই দৃশ্য। ট্রাফিক আইন না মেনে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী তোলার অপেক্ষায়। কিন্তু এই অপেক্ষা কি আর শেষ হয়? বাসের প্রায় সব আসন পূর্ণ হয়ে গেলেও চালক বাস ছাড়ে না। চালকের উদ্দেশ্য অফিসগামী যাত্রীদের বসিয়ে-দাঁড়িয়ে প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ করে বাস ছাড়া। তীব্র গরমে যখন যাত্রীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন দু-একটি প্রতিবাদের স্বর উঠলে শুরু হয় আরেক গণ্ডগোল। এই চিত্র শুধু মিরপুর ১০-এর নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডেরই একই চিত্র। ফিটনেসের অভাব, গাড়ির কালো ধোঁয়া, এবং যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে গণপরিবহন দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ সব থেকে বেশি কারণ তাদের জন্য গণপরিবহনই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। বিশেষ করে নারীদের জন্য বিষয়টি বেশি কষ্টকর; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে যৌন হয়রানির সম্মুখীন হয়।

এই অবস্থায় অনেক উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছে। ফলে সড়কে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা, কিন্তু বাড়ছে না সড়কের আয়তন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জুলাই ২০২৫ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস রেজিস্ট্রেশন হয়েছে সর্বমোট ৬৩৫২৭ টি। প্রতি মাসে রাস্তায় নতুনভাবে যোগ হচ্ছে ১০৫৮৭ টি ব্যক্তিগত গাড়ি, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৫৮১২ টি। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে ঢাকার যানজট পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র পরিবহন বিশেষজ্ঞ রাজেশ রোহাতগি জানান যে, গত ১০ বছরে ঢাকায় গড় যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এছাড়া, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই গতি আরও কমে ৪ কিলোমিটার/ঘন্টায় নেমে যেতে পারে, যা হাঁটার থেকেও ধীর হবে। এর প্রধান কারণ হল চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিপুল ফারাক। একটি আধুনিক শহরে যেখানে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন, সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এই সড়কের সীমিত পরিমাণ জায়গার উপর চলছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন—বাস, মোটরবাইক, প্রাইভেট কার, রিকশা, সিএনজি। প্রশ্ন জাগে—ক্রমবর্ধমান এই যানবাহন গুলো চলবে কোথায়? রাস্তায় জায়গা তো বাড়ছে না বা লেন সংখ্যাও বাড়ছে না।

হাসপাতাল, বাজার ও স্কুল-কলেজের মতো ব্যস্ত এলাকার পাশে ব্যক্তিগত ও গণপরিবহনের কারণে মূল সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অপর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং ও ওভারব্রিজ এবং সেগুলোর ভুল অবস্থানের কারণে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে বাধ্য হয়। চালকদের জেব্রা ক্রসিংয়ে না থামা এবং পথচারীদের আইন অমান্য করার ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে, যা চালক-পথচারীর মধ্যে এক যুদ্ধংদেহী অবস্থার সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও “বাংলার টেসলা” খ্যাত অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত চলাচলের উপদ্রব, যা নগরীর জনদুর্ভোগ আরও বাড়াচ্ছে।

তবে শুধু যে সাধারণ মানুষ বা চালকরাই ট্রাফিক আইন মানে না তা নয়, কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপগুলোও অনেক সময় বাস্তবসম্মত নয়। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র ২০২২ সালে জোড়-বিজোড় নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরের মত গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করার কথা বলেছিলেন। আবার, রাজধানীর গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন রুটে ২১ টি কোম্পানির ২৬১০ টি “গোলাপি বাস” চালানো শুরু হয়েছিল, বলা হয়েছিল যেখানে ভিন্ন নামে কোনো বাস থাকবে না, কাউন্টার ও ই-টিকেটিং সিস্টেম থাকবে। কিন্তু সপ্তাহ না যেতেই সেই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। আবার কিছুদিন আগে অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে বাসরুট নিয়ে একটি পোস্ট দেয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ঢাকার সকল বাসকে একটি একক ব্যবস্থার অধীনে নেয়া হবে এবং কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত রুট ও স্টপেজ মেনে চলতে হবে। কিন্তু কবে নাগাদ এই ব্যবস্থায় বাস পরিচালনা করা হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপের করে বলা হয় নি। সরকারকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যেন গোলাপি বাসের মত এই প্রকল্পটি ব্যর্থ না হয়।

জুলাই ২০২৪ পরবর্তী সময় আমরা শুনেছিলাম পুরো নগরীর ডিজিটালাইজড ট্র্যাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, সিটি কর্পোরেশনকে ঢেলে সাজানো কিংবা ওয়াটার বাসের মত উদ্যোগের কথা। কিন্তু আজ অবধি সেগুলোর কোনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চোখে পড়ে নাই বা ক্ষেত্রবিশেষে শুরু হওয়ার পরপরই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে শুধু নিয়ম-নীতি বা কেবল সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে খেয়াল রাখলেই চলবে না বরং সড়কের সামগ্রিক পরিবর্তনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

সুপারিশসমূহ

যানজট নামক এই নগরীর যন্ত্রণা দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত নিম্নোক্ত কার্যকর পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:

গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার ও শৃঙ্খলা

  • অবিলম্বে বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন (BRR)-এর জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা ঘোষণা করে একক ব্যবস্থার অধীনে সকল বাস পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
  • যাত্রী তোলার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ এবং অবৈধ পার্কিং রোধে প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে কঠোর পুলিশি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
  • গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি স্থাপন, নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণ এবং সেই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রণ ও পার্কিং ব্যবস্থা

  • ব্যক্তিগত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও বার্ষিক ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে এর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং গণপরিবহনকে আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • প্রধান সড়কের পাশে অননুমোদিত পার্কিং বন্ধ করে বহুতল স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং অবৈধ গাড়ি দ্রুত টুইং (Towing)-এর মাধ্যমে সরিয়ে নিতে হবে।

পথচারী সুরক্ষা ও হালকা যান নিয়ন্ত্রণ

  • পথচারীদের জন্য সুবিধাজনক স্থানে আধুনিক এসকেলেটর-যুক্ত ওভারব্রিজ এবং জেব্রা ক্রসিং স্থাপন করতে হবে।
  • চালকরা যেন জেব্রা ক্রসিং-এ অবশ্যই থামেন, সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
  • প্রধান সড়কগুলো থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য অননুমোদিত হালকা যানের চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

প্রযুক্তিগত ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান:

  • দীর্ঘ অপেক্ষার পর মুখ থুবড়ে পড়া ডিজিটাল ট্র্যাফিক সিগন্যালগুলো অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গরূপে সকল জায়গায় চালু করে ট্র্যাফিকের ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনতে হবে।
  • দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ঢাকা শহরের নৌপথগুলোতে ওয়াটার বাস পরিষেবা চালুসহ মেট্রোরেলের সংযোগকারী পরিষেবা উন্নত করতে হবে।

When Silence Speaks: Understanding Bangladesh’s Undecided Voters

For over a decade, since 2014, Bangladeshis have been denied the chance to vote freely, as the Awami League maintained unilateral dominance over national politics. Following the events of August 5, 2024, there was a revitalized sense of optimism, with residents expecting a transparent and credible election. Although enthusiasm remains strong, citizens still seem uncertain about whom they can trust with their mandate. A BIGD pulse survey shows that nearly half of the voters (48% of respondents) remain undecided. 

This indecision is not merely statistical noise; it is a vocal, collective pause for a country with a long history of political loyalties and entrenched party lines. This is not due to the numbers themselves, but rather the silences that conceal them. During my time with the report, I was unable to shake one nagging question: why are so many citizens mired in uncertainty? I engaged in conversations with individuals, including friends, acquaintances, and strangers at tea stalls. They generously shared their perspectives on this conundrum. Their voices, when combined, begin to illustrate the human realities that lie beneath the numbers. 

Firstly, the Awami League is shrouded in a delicate quiet. Several people hinted that they felt concern  for the party, but they didn’t explicitly express it because they were afraid of the social shame and political backlash. A  political communication theory by Elisabeth Noelle-Neumann explains how people’s willingness to express their opinions in public depends on how they perceive the views of others around them. This is called a “spiral of silence”—when people refrain from expressing their opinions because they fear it might make them unpopular or put them at risk.. People who supported the party might not have disappeared; they might have just gone underground. This means that the vacuum is both real and performative: it’s not a lack of allegiance itself, but an absence of allegiance that can be seen. This makes it harder to understand voters who are categorically undecided, since many of them may already have preferences they’re afraid to share. 

Secondly, the significance of the past kept coming up. A number of individuals I talked to admitted to me that they were once staunch followers of the Awami League. However, they feel that their allegiance appears misguided and even dangerous now that the party is no longer in power. An almost regretful man confided in me that changing sides felt like betraying an identity that has been dear to him for a long time, but that remaining loyal is just as foolish. The difficulty of transferring one’s political allegiance is a fundamental psychological fact that this predicament highlights. 

Thirdly, another voice I heard was very blunt: “I will only vote for a party that can help me. If not, I won’t waste my vote.” This was not an unusual feeling. A number of them said they think the BNP will win, and even though they aren’t sure, they are leaning toward supporting the likely winner so they don’t “throw away” their vote. This judgment is not cynical; it is based on the logic of survival in a political environment where failed promises and bad government have made people less trusting. 

Fourthly, it was also very strange that new political actors were almost completely invisible. After the Awami League and the BNP, most people couldn’t even name another party, let alone believe it could win. “How can I vote for a party I’ve never even heard of?” one person remarked with a laugh when I mentioned new groups. This isn’t because the candidates aren’t good; it shows how strongly the two-party story holds our attention. In binary politics, there hasn’t been much room for alternatives to gain authority for decades. Right now, people are calling the state of affairs “anarchy” for a good reason: it speaks not just of disappointment but also of a profound loss of faith in political institutions.

Finally, another source of uncertainty is the lack of trust in the new student-led groups. Despite the fact that these groups were instrumental in the recent uprising and captured the public’s attention, individuals remain hesitant to grant them political authority. One individual stated, “Protesting is one thing; running a country is another.” This apprehension does not necessarily indicate that the general public lacks confidence in young individuals assuming leadership roles; rather, it reflects their anxiety and tendency to prioritize safety above everything else. 


The Broader Picture: Fear, Fatigue, and Fragile Hope

These conversations indicate that voters not being able to decide is not a singular problem to be simplified. There are historical alliances, alternatives that can’t be seen, cold calculations, muted sympathies, and cautious skepticism all mixed together. At the heart of it all is a shared tiredness.

People are fed up with promises that don’t hold up after the election. They are exhausted with leaders who don’t take care of justice, safety, or respect. They are exasperated by officials of different political parties and groups playing the same game. But things aren’t completely lost. Notably, 70% of the Pulse Survey respondents think the next election might be fair, which is a cautiously optimistic number. An undecided voter isn’t a sign of disengagement; rather, they are a sign of contested hope. By remaining silent about their voter preferences, these respondents are subtly calling for parties to prove that politics can mean more than betrayal.

Ultimately, the forthcoming months will be crucial, as over half of the electorate remains undecided. Political parties cannot presume that these individuals will cast their votes in their favour; they must demonstrate their commitment to reforming law and order, justice, safety, and accountability, rather than merely discussing these issues. The undecided voter shows us,  as a nation, something beyond political agendas. They ask whether our democracy can still inspire belief, if we can escape cycles of betrayal and allegiance, and if we can envision a political system that serves the populace rather than the leaders.

প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব জিইয়ে রাখছে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও পারিবারিক বন্ধনের অপরিসীম গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে বড় হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মানবসমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান এবং তার সদস্যদের প্রতি আমাদের প্রত্যেকেরই গভীর টান রয়েছে। আমাদের সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদ, আনন্দ-বিষাদের মুহূর্তগুলোর একটি বিশাল অংশ জুড়েই থাকে পরিবার। পরিবার একটি ভরসার নাম, আপন নীড়, আশ্রয়স্থল।

অথচ নিষ্পেষণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও যে পরিবারের একটি ভূমিকা আছে, এ সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ নির্যাতনের আঁতুরঘর পরিবার। গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) পরিচালিত “নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪” এ উঠে এসেছে দেশের ৭০ শতাংশ নারীই তাঁর জীবদ্দশায় স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যেখানে জরিপকালীন সময়ের ঠিক আগের এক বছরে এই হার ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ বছরে প্রায় অর্ধেক নারী তাঁর স্বামীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। 

নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৩২২ জন নারী ও কন্যা শিশুর, যার মধ্যে হত্যার শিকার ২০৮ জন ও আত্মহত্যা করেছেন ১১৪ জন। এর মধ্যে ১৩৩টি হত্যাকাণ্ড স্বামীর, ৪২টি স্বামীর পরিবারের সদস্যের এবং ৩৩টি জন্মগত পরিবারের সদস্যের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। আসকের তথ্যমতে, একই সময়ে গত বছরের তুলনায় পারিবারিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও সামাজিক আন্দোলন সত্ত্বেও কেন আমাদের এখনও এরকম ভয়াবহ পরিসংখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়, সে প্রশ্নে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও বিচারহীনতা যেমন একটি প্রধান নিয়ামক, তেমনি পরিবারকে নির্বিচারে একটি সুরক্ষাদানকারী, কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা এবং যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও দায় রয়েছে। 

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত লক্ষ্য থেকে যথেষ্ট দূরে থাকার পরেও দিন দিন মোটাদাগে বেড়েছে। কিন্তু সমাজে বিদ্যমান জেন্ডার প্রথাগুলো এত গভীরভাবে প্রোথিত যে একটি শিশুও বাল্যকালেই জেনে যায় নারীদের প্রধান দায়িত্ব ঘর সামলানো এবং সন্তান জন্মদান ও লালনসহ পুনরুৎপাদনশীল কাজগুলো সম্পাদন করা। ফলে একজন নারীর সামাজিক মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় তাঁর কেমন ভালো বিয়ে হয়েছে, সন্তান প্রতিপালনে তিনি কতটা পারদর্শী, সর্বোপরি একটি “সুখী সংসার” গঠনে তাঁর “গুণ” কতটা।     

একজন নারী তখনই একটি নির্যাতনমূলক সম্পর্কের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারেন যখন সেই সম্পর্ক থেকে তাঁর বের হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের সমাজে নারীর মূল্যায়ন যেহেতু মূলত সংসারে তাঁর অবদানের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু নারী নিজেও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে অনাগ্রহী থাকেন এবং তাঁর জন্মগত পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও তাকে বিচ্ছেদের ব্যাপারে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত করেন। এখানে পরিবারকে নারীর সুরক্ষাদানের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গণ্য করাও একটি কারণ। 

ফলশ্রুতিতে অনেক নারী নিয়ত নির্যাতন সত্ত্বেও নিপীড়নমূলক বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং সহিংসতাকে জীবনের স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবে মেনে নেন, অর্থাৎ আত্তীকরণ করেন। “নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪” এর তথ্যমতে, স্নাতক ও তার ওপরের ডিগ্রিধারী নারী এবং কোনোরূপ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা নারীর জরিপকালীন সময়ের ঠিক আগের এক বছরে সহিসংসতার অভিজ্ঞতায় কোনো তফাত নেই। প্রায় একই চিত্র দেখা যায় ধনী এবং দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রেও। এই পরিসংখ্যানগুলো ইঙ্গিত দেয়, অনেক সময় পর্যাপ্ত শিক্ষা ও সম্পদ থাকার পরেও নারী যেভাবেই হোক সংসার টিকিয়ে রাখাকে প্রাধান্য দিয়ে নিপীড়নমূলক বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকেন।

এ বিষয়ে একই জরিপে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান হচ্ছে ৬৪ শতাংশ নারীই স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হবার কথা কাউকে বলেন না। নারীর এই চুপ করে থাকার পেছনে অনেকগুলো কারণের একটি পরিবারের সুনাম রক্ষা করা। পরিবারের সুনামের সাথে নারীর নিজের মর্যাদা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিধায় নির্যাতনের কথা নারী নিজের মধ্যেই চেপে রাখেন। এই বিষয়টি শুধু স্বামীর দ্বারা নয়, বরং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা সহিংসতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারী শিখেছেন পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতিত হবার কথা প্রকাশিত হলে পারিবারিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। মূলত পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের কাছ থেকেই এই শিক্ষা তাঁরা লাভ করেন। তাই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েও পরিবারের সম্মান রক্ষার ধারক-বাহক হয়ে ওঠেন নারী, তাঁর ব্যক্তিসত্তা ও অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত ও ক্ষতিকর জেন্ডার প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনসহ প্রয়োজন পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি নারীর স্বতন্ত্র, ব্যক্তিগত পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া। গবেষণা বলে, নারীর আয়ত্তে যখন বস্তুগত (যেমন: অর্থ, সম্পত্তি) ও মানবিক (যেমন: শিক্ষা, দক্ষতা) রসদের সাথে সাথে সামাজিক রসদ যেমন সহায়ক সামাজিক বলয় (সুবিবেচক জন্মগত পরিবার, বন্ধু, জনসমাজ) থাকে তখন তিনি নিপীড়নমূলক সম্পর্কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ও প্রয়োজনে বিচ্ছেদে উৎসাহিত হন। পারিবারিক পরিচয়ের বাইরেও নিজস্ব একটি পরিচয়ে নারী যখন মর্যাদাপ্রাপ্ত হন, তখন সহিংসতার আত্তীকরণ ও যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখা থেকে তিনি বিরত থাকেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকেও একই শিক্ষা দেন।     

পরিবার নিয়ে বিষোদগার করা কিংবা বাছবিচারহীনভাবে পরিবারকে নারীদের জন্য একটি ক্ষতিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিকাশে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ব্যক্তি নারীকে কেবলমাত্র পারিবারিক পরিচয়ে আবদ্ধ করা এবং যে করেই হোক না কেন, পরিবার রক্ষা করার মানসিকতা জিইয়ে রাখার মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আমাদের প্রত্যেকের উচিত সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীর জন্য একটি সহায়ক সামাজিক বলয় নির্মাণে ভূমিকা রাখা, যাতে প্রতিটি সহিংসতার ঘটনার বিপক্ষে নারী প্রতিবাদ করায় উদ্বুদ্ধ হন। এর পাশাপাশি নারীকে তাঁর আপন পরিচয়ে মূল্যায়ন করার দৃষ্টিভঙ্গি লালন করাও এখন সময়ের দাবি। আমাদের পরিবারগুলো নারীর জন্য নিরাপদ এবং ব্যক্তিগত ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠুক, এটি যেমন আকাঙ্ক্ষিত, তেমনি নিষ্পেষণের কারখানা হয়ে ওঠা পরিবারগুলো থেকে নারীর মুক্তি হোক, সেটিও সমানভাবেই কাম্য।