গতবছর জুলাই আন্দোলনের পর আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম এক নতুন বাংলাদেশের, যেখানে প্রতিটি খাতে আসবে যুগান্তকারী কিছু সংস্কার। ঢাকা নগরবাসীদের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার এই নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবে। অবকাঠামোগত উন্নতি না হলেও, আইন প্রয়োগে আসবে গতি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্য বলছে—যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে এর ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে প্রতিবছর ৩টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।
প্রতিদিনের মতো আজও সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে মিরপুর ১০ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে দেখা গেলো সেই একই দৃশ্য। ট্রাফিক আইন না মেনে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী তোলার অপেক্ষায়। কিন্তু এই অপেক্ষা কি আর শেষ হয়? বাসের প্রায় সব আসন পূর্ণ হয়ে গেলেও চালক বাস ছাড়ে না। চালকের উদ্দেশ্য অফিসগামী যাত্রীদের বসিয়ে-দাঁড়িয়ে প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ করে বাস ছাড়া। তীব্র গরমে যখন যাত্রীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন দু-একটি প্রতিবাদের স্বর উঠলে শুরু হয় আরেক গণ্ডগোল। এই চিত্র শুধু মিরপুর ১০-এর নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডেরই একই চিত্র। ফিটনেসের অভাব, গাড়ির কালো ধোঁয়া, এবং যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে গণপরিবহন দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ সব থেকে বেশি কারণ তাদের জন্য গণপরিবহনই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। বিশেষ করে নারীদের জন্য বিষয়টি বেশি কষ্টকর; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে যৌন হয়রানির সম্মুখীন হয়।
এই অবস্থায় অনেক উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছে। ফলে সড়কে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা, কিন্তু বাড়ছে না সড়কের আয়তন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জুলাই ২০২৫ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস রেজিস্ট্রেশন হয়েছে সর্বমোট ৬৩৫২৭ টি। প্রতি মাসে রাস্তায় নতুনভাবে যোগ হচ্ছে ১০৫৮৭ টি ব্যক্তিগত গাড়ি, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৫৮১২ টি। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে ঢাকার যানজট পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র পরিবহন বিশেষজ্ঞ রাজেশ রোহাতগি জানান যে, গত ১০ বছরে ঢাকায় গড় যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এছাড়া, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই গতি আরও কমে ৪ কিলোমিটার/ঘন্টায় নেমে যেতে পারে, যা হাঁটার থেকেও ধীর হবে। এর প্রধান কারণ হল চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিপুল ফারাক। একটি আধুনিক শহরে যেখানে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন, সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এই সড়কের সীমিত পরিমাণ জায়গার উপর চলছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন—বাস, মোটরবাইক, প্রাইভেট কার, রিকশা, সিএনজি। প্রশ্ন জাগে—ক্রমবর্ধমান এই যানবাহন গুলো চলবে কোথায়? রাস্তায় জায়গা তো বাড়ছে না বা লেন সংখ্যাও বাড়ছে না।
হাসপাতাল, বাজার ও স্কুল-কলেজের মতো ব্যস্ত এলাকার পাশে ব্যক্তিগত ও গণপরিবহনের কারণে মূল সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অপর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং ও ওভারব্রিজ এবং সেগুলোর ভুল অবস্থানের কারণে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে বাধ্য হয়। চালকদের জেব্রা ক্রসিংয়ে না থামা এবং পথচারীদের আইন অমান্য করার ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে, যা চালক-পথচারীর মধ্যে এক যুদ্ধংদেহী অবস্থার সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও “বাংলার টেসলা” খ্যাত অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত চলাচলের উপদ্রব, যা নগরীর জনদুর্ভোগ আরও বাড়াচ্ছে।
তবে শুধু যে সাধারণ মানুষ বা চালকরাই ট্রাফিক আইন মানে না তা নয়, কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপগুলোও অনেক সময় বাস্তবসম্মত নয়। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র ২০২২ সালে জোড়-বিজোড় নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরের মত গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করার কথা বলেছিলেন। আবার, রাজধানীর গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন রুটে ২১ টি কোম্পানির ২৬১০ টি “গোলাপি বাস” চালানো শুরু হয়েছিল, বলা হয়েছিল যেখানে ভিন্ন নামে কোনো বাস থাকবে না, কাউন্টার ও ই-টিকেটিং সিস্টেম থাকবে। কিন্তু সপ্তাহ না যেতেই সেই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। আবার কিছুদিন আগে অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে বাসরুট নিয়ে একটি পোস্ট দেয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ঢাকার সকল বাসকে একটি একক ব্যবস্থার অধীনে নেয়া হবে এবং কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত রুট ও স্টপেজ মেনে চলতে হবে। কিন্তু কবে নাগাদ এই ব্যবস্থায় বাস পরিচালনা করা হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপের করে বলা হয় নি। সরকারকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যেন গোলাপি বাসের মত এই প্রকল্পটি ব্যর্থ না হয়।
জুলাই ২০২৪ পরবর্তী সময় আমরা শুনেছিলাম পুরো নগরীর ডিজিটালাইজড ট্র্যাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, সিটি কর্পোরেশনকে ঢেলে সাজানো কিংবা ওয়াটার বাসের মত উদ্যোগের কথা। কিন্তু আজ অবধি সেগুলোর কোনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চোখে পড়ে নাই বা ক্ষেত্রবিশেষে শুরু হওয়ার পরপরই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে শুধু নিয়ম-নীতি বা কেবল সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে খেয়াল রাখলেই চলবে না বরং সড়কের সামগ্রিক পরিবর্তনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
সুপারিশসমূহ
যানজট নামক এই নগরীর যন্ত্রণা দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত নিম্নোক্ত কার্যকর পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:
গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার ও শৃঙ্খলা
- অবিলম্বে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন (BRR)-এর জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা ঘোষণা করে একক ব্যবস্থার অধীনে সকল বাস পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
- যাত্রী তোলার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ এবং অবৈধ পার্কিং রোধে প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে কঠোর পুলিশি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
- গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি স্থাপন, নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণ এবং সেই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রণ ও পার্কিং ব্যবস্থা
- ব্যক্তিগত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও বার্ষিক ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে এর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং গণপরিবহনকে আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- প্রধান সড়কের পাশে অননুমোদিত পার্কিং বন্ধ করে বহুতল স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং অবৈধ গাড়ি দ্রুত টুইং (Towing)-এর মাধ্যমে সরিয়ে নিতে হবে।
পথচারী সুরক্ষা ও হালকা যান নিয়ন্ত্রণ
- পথচারীদের জন্য সুবিধাজনক স্থানে আধুনিক এসকেলেটর-যুক্ত ওভারব্রিজ এবং জেব্রা ক্রসিং স্থাপন করতে হবে।
- চালকরা যেন জেব্রা ক্রসিং-এ অবশ্যই থামেন, সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
- প্রধান সড়কগুলো থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য অননুমোদিত হালকা যানের চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।
প্রযুক্তিগত ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান:
- দীর্ঘ অপেক্ষার পর মুখ থুবড়ে পড়া ডিজিটাল ট্র্যাফিক সিগন্যালগুলো অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গরূপে সকল জায়গায় চালু করে ট্র্যাফিকের ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনতে হবে।
- দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ঢাকা শহরের নৌপথগুলোতে ওয়াটার বাস পরিষেবা চালুসহ মেট্রোরেলের সংযোগকারী পরিষেবা উন্নত করতে হবে।