“ছাত্র আপনারে দিয়ে গেলাম, আপনি শুধু হাড্ডিগুলা ফেরত দিয়েন”—বাংলাদেশে শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে অভিভাবকদের বলা একটি অতিপরিচিত বাক্য। এর পিছনে যে ভাবনাটি কাজ করে তা হল শিশুকে মূলত মারধর করেই শৃঙ্খলা শেখানো সম্ভব।
প্রতিটি বাবা-মা চান তাদের সন্তান সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল হোক, এবং জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকুক। এই ধারণা থেকে একটা সময় পর্যন্ত শিক্ষকরা ‘শাসন’ করার নামে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি প্রদান করতেন আর অধিকাংশ অভিভাবক সেটিকে সমর্থন করতেন।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শৃঙ্খলা যখন শারীরিক বা মানসিক শাস্তিতে পরিণত হয়, তখন তা শিশুকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শারীরিক শাস্তি দিলে শিশুদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, তাদের শেখার আগ্রহ নষ্ট হয়, এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ফলে তাদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় (BIGD & World Bank, 2023)। সর্বোপরি, শারীরিক শাস্তি শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।
এসকল নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) এবং BLAST-২০১০ সালে আদালতে রিট করে (ASK & BLAST, 2010)। এই রিটের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি, হাইকোর্টের এক রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধের নির্দেশনা প্রদান করা হয় (Ministry of Education, 2011)।
আইন করে স্কুলে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হলেও পারিবারিক পরিসরে এখনো শিশুরা শারীরিক শাস্তির স্বীকার হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ৯০% বাবা-মা বাড়িতে শিশুদের শাস্তি দেয় (UNICEF, 2019)। আরেকটি গবেষণা দেখাচ্ছে ১–১৪ বছরের প্রায় ৮৮.৮% শিশু পারিবারিক পরিসরে শারীরিক বা মানসিক শাস্তির সম্মুখীন হয় (BBS/MICS, 2019)। যেসব শিশু বাড়িতে নিয়মিত মারধর বা শারীরিক শাস্তির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় তাদের মৌলিক পঠন দক্ষতা স্বাভাবিকের প্রায় ৬৫% পর্যন্ত কমে যায় এবং গণিতিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ৩৭% পর্যন্ত কমে। কঠোর অভিভাবকত্বের কারণে শিশুদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, ভয়, ও আক্রমণাত্মক আচরণ তৈরি হয় (BIGD & World Bank, 2023)। শারীরিক শাস্তির কারণে শিশুর মনোযোগ কমে যায়, তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলতে পারে না, এবং তাদের বন্ধু তৈরি করতেও অসুবিধা হয়। এগুলো শিশুর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করে (Gershoff, 2017)।
শিশুর উন্নয়ন, বিকাশ, ও শিশু অধিকার বিষয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহও বলছে-ঘরে ও স্কুলে শারীরিক শাস্তি প্রদান বাংলাদেশের শিশুদের শেখার পথে বড় বাধা। ফলে শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক ধাপেই শিশুর ভবিষ্যতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় (Global Initiative, 2020)। আর বাংলাদেশে যেখানে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ কোনো সহায়তাও নেই, সেখানে এই ক্ষতি তাদের শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যতের ওপর সার্বিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের পাশাপাশি অধিকাংশ অবিভাবকও এ বিষয়ে সচতন; বিআইজিডি ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে ৬৫% অভিভাবক শিশুদের শারীরিক শাস্তি প্রদান করার বিষয়টি সমর্থন করে না (BIGD & World Bank, 2023)।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—অভিভাবকেরা কেনো শিশুদের মারধর করেন? শুধুমাত্র শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য? রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে? নাকি এর পেছনে কাজ করছে আরো গভীর কোনো সামাজিক চাপ?
আমাদের সমাজে ‘ভালো ছাত্র’ হওয়া বা পরীক্ষায় ‘ভালো ফলাফল’ অর্জন করার চাপ শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর উপরেই না, এটি অভিভাবকদের উপরেও প্রভাব ফেলে। প্রতিবেশির ছেলে ‘ভালো রেজাল্ট’ করলো, আত্মীয়ের মেয়ে বৃত্তি পেলো, কিংবা কেউ নামকরা স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল—এসব নিয়ে অনেক বাবা-মায়েরা এক ধরনের সামাজিক তুলনা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েন। এই তুলনামূলক প্রতিযোগিতা অভিভাবকদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে। ফলে শিশুর ছোটখাটো ভুলকেও তারা বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ভাবেন কঠোর শাসন ছাড়া সন্তান ‘মানুষ হবে না’। শিশুর প্রতি ভালোবাসা ও ধৈর্যের জায়গা দখল করে নেয় শাসন আর শাস্তি।
তবে অভিভাবকদের এই চাপের পেছনে কিছু কাঠামোগত কারণ এবং কঠোর সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে নম্বরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়, সেখানে বাবা-মায়েরা সন্তানের সাফল্যকে নিজেদের মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন। সন্তান পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়লে সেটিকে তারা নিজেদের ব্যর্থতা মনে করেন এবং এই হতাশার প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর। এই মানসিক চাপ শুধু সন্তানের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করে না, বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করে। যখন সফলতার মাপকাঠি হয় পরীক্ষার ফলাফল এবং শিশুর আগ্রহ, প্রতিভা, ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তখন শিশু নিছক নম্বরযন্ত্রে পরিণত হয়। তারা ভাবতে শুরু করে ভালোবাসা বা স্বীকৃতি পাওয়ার একমাত্র শর্ত হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করা। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা হতাশা এবং মানসিক চাপে ভোগে। সম্প্রতি একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা তাদের মানসিক চাপের বিষয়টিকে সামনে আনে। বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী তার মৃত্যুর আগে পরিবারের উদ্দেশ্যে লিখেছিল:
“I am tired of constantly fighting with myself. I just want some rest. Please forgive me. I couldn’t return the love you gave me.”
(দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১১ এপ্রিল ২০২৪)
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পারিবারিক পরিসরে শিশুর উপর হওয়া শারীরিক শাস্তি বন্ধ করা অতীব জরুরি। এর সাথে এটিও ভাবতে হবে কীভাবে শিশুর স্বাভাবিক শেখার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস পুনঃস্থাপন করা যায়। অভিভাবকদের বুঝতে হবে শৃঙ্খলা মানে ভয় বা আঘাত নয়, বরং দায়িত্বশীল আচরণ শেখানো। স্কুল ও পরিবার দুই জায়গাতেই ইতিবাচক শৃঙ্খলার অনুশীলন করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বাবা-মা ও শিক্ষকদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি থাকা দরকার, যেখানে তারা শারীরিক শাস্তির ক্ষতি সম্পর্কে জানবেন। সামাজিক প্রচারণা ও মিডিয়া ব্যবহার করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে, যাতে পরিবারের মধ্যে ইতিবাচক শৃঙ্খলা ও শিশু অধিকার সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।
শাস্তি হয়তো মুহূর্তের জন্য নিয়ন্ত্রণ আনে, ফলে এটিকে সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হারিয়ে যায় শিশুদের শেখার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস, ও সৃজনশীলতা। অন্যদিকে ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা আর সহায়ক পরিবেশ পেলে শিশুরা শুধু ভালো ফলাফলই করে না, বরং বড় হয়ে একজন মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হয়ে ওঠে।
পারিবারিক পরিসরে শিশুর উপর শারীরিক শাস্তির প্রভাব সম্পর্কিত বিআইজিডির গবেষণাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন
