বাংলাদেশের মানুষের অসাধারণ একটা শক্তি আছে—ঘুরে দাঁড়ানোর। এ হল মানুষের ভেতরের রেজিস্ট্যান্স, এইটা জেমস সি. স্কট এর ওয়েপন্স অফ দ্য উইক (১৯৮৫) এর মতো, সাধারণ মানুষের সূক্ষ্ম ও নীরব প্রতিরোধ, যা হতাশাজনক পরিস্থিতিতেও তাদের নিজের ওপর আস্থা (agency) এবং রাজনৈতিক সচেতনতা (political consciousness) বজায় রাখে। বাংলাদেশের মানুষ সবসময় এই রেজিস্ট্যান্স দেখিয়েছে—টিকে থেকেছে, সয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিআইজিডি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির “ভোটার আচরণ এবং প্রচারণার কৌশল” শীর্ষক গবেষণার মাঠপর্যায়ের কাজের অংশ হিসেবে, যখন কুমিল্লার রসুলপুরের গ্রামের কাঁচা রাস্তা থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পাকা রাস্তায় হেঁটেছি, আমি মানুষের মধ্যে অদ্ভুত রকমের একটি মিল খুঁজে পেয়েছি—তা হলো ভীষণ আশা নিয়ে বেঁচে থাকা। মানুষ আহত হয়, কিন্তু সেই ক্ষত কাটিয়ে আবার আশাবাদী হয়। দেশ নিয়ে, কমিউনিটি নিয়ে স্বপ্ন বোনে—
“এবার যদি কিছু হয়, দেখি না কী হয়।”
এই পুনরাবৃত্ত আশাবাদ কোনো সরল আবেগ নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা ও প্রতারণার অভিজ্ঞতার মধ্যে টিকে থাকার একটি সামাজিক কৌশল। এই আশার কারণেই মানুষ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে না পড়ে বা আত্মসমর্পণ না করে, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে।
আশার সাথে আছে সংশয়। এই সংশয়ের উৎস বারংবার প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা, আশাহত হওয়ার ইতিহাস। তবু তা মানুষকে ভাঙেনি, রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেনি বরং আরও সতর্ক করেছে। এই ঐতিহাসিক উপলব্ধি মানুষের ভেতরে রাজনৈতিক আচরণে এক ধরনের সতর্কতা তৈরি করেছে। এই সংশয় মানুষের এজেন্সিকে দুর্বল করে না; বরং নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুতি মূল্যায়নের সক্ষমতা তৈরি করে। ফলে আশা ও সংশয় একে অপরের বিরোধী নয়; বরং একসঙ্গে মিলেই মানুষের রাজনৈতিক আচরণকে রূপ দেয়।
রসুলপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আগ্রাবাদের মোড়ে মোড়ে—বিভিন্ন শ্রেণি, বয়স ও লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় দেখা যায়, ভৌগোলিক ও সামাজিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় মিল রয়েছে। প্রত্যাশা কেবল শহর বা গ্রামের আলাদা বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি সার্বজনীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি (shared political condition), যেখানে মানুষ রাষ্ট্রের কাছে একই ধরণের জবাবদিহি ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা করে। আমি ওই একই কমিউনিটির মানুষ হিসেবে বারংবার নিজেকেই খুঁজে পেয়েছি।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এই রাজনৈতিক স্মৃতিকে আরো দৃঢ় করেছে, এই গণঅভ্যুত্থানে মানুষ দেশ নিয়ে আশাবাদী হয়েছিল। সেই আশাকে বুকে বেঁধে তারা প্রাণ দিয়েছে—কেউ চোখ হারিয়েছে, কেউ পা; অসংখ্য মানুষ আজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার অনেকে বিদেশের উন্নত জীবন ছেড়ে দেশের জন্য কিছু করবে বলে ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরেছে—কেন? এই একটিমাত্র দেশের স্বপ্ন বুনে।
এই ত্যাগ কেবল আবেগীয় স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে এবং তাদের বিচারবোধকে প্রভাবিত করেছে। মাঠপর্যায়ের কথোপকথনে স্পষ্ট হয়, মানুষ মনে রাখে কারা সংকটের সময় পাশে দাঁড়িয়েছে এবং কারা দাঁড়ায়নি। ফলে গণঅভ্যুত্থান ভোট, নেতৃত্ব ও আস্থার প্রশ্নে একটি নতুন রাজনৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও মানুষ আবারও জখম হয়েছে—হয়রানি, বাড়ি পোড়ানো, নিরাপত্তাহীনতা। তবুও মানুষ সহনশীল থেকেছে। তারা নির্বাচন নিয়ে, সরকার নিয়ে, নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন বুনছে।
মানুষের স্বপ্নকে জিইয়ে রেখে “রাষ্ট্রীয় সংস্কার”-এর মতো নতুন বয়ান (Discourse) তৈরি হয়েছে। অনেক রাজনীতিবিদ মানুষের স্বপ্নের উপর ভর করে ক্ষমতায় যেতে চান, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে এই আশাপূরণের সদিচ্ছা চোখে পড়ে না।
তবুও মানুষ নতুন মুখ, নতুন নেতৃত্ব, নতুন সরকার নিয়ে আশাবাদী হয়, রাজনীতি নিয়ে স্বপ্ন দেখে। মূলত এই আশাই তাদের রাজনীতিতে যুক্ত রাখে, যদিও একইসঙ্গে সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হয়ে উঠে। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক জটিল প্যারাডক্স।
মানুষ ভাবছে—“এরা যদি দেশের জন্য কিছু করে? পারবে কি?”
এই ‘পারবে কি’-র সংশয়ই সাহসে রূপ নেয়, যখন মানুষ দেখে তরুণ প্রাণ ইতিহাসের নানা সময়ে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। এই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগের স্মৃতিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল; মূলত মুক্তিযুদ্ধে জনগণের সাহস, ধৈর্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত মানুষকে নতুন করে জাগ্রত করেছিল। তেমনিভাবে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রেরণা জোগাবে।
এই গণঅভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের ভোটহীন নির্বাচনী সংস্কৃতি থেকে সরে এসে মানুষকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটকেন্দ্রমুখী হওয়ার আশা দিয়েছে। অতীতের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই নতুন বাস্তবতার তুলনায়, এবং সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যাশার বিবেচনার মধ্যেই আমি কৃতজ্ঞতা ও আস্থার স্বরূপ দেখতে পেয়েছি।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের নিম্নবর্গের মানুষের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা দৈনন্দিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই রাজনীতি উপলব্ধি করে। তাদের কণ্ঠ রাষ্ট্রে কমই শোনা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা সবচেয়ে বেশি তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে। গণঅভ্যুত্থানপ্রসূত আশা নিম্নবর্গের মানুষের কাছে ভবিষ্যতের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার একটি মাধ্যম। একইসাথে, নিম্নবর্গের মানুষের এই প্রত্যাশা জেমস সি. স্কটের ‘মোরাল ইকোনমি’ (১৯৭৬) এর ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; এই প্রত্যশার মধ্যে একটা নৈতিক দাবি নিহিত রয়েছে, যা রাষ্ট্রকে সংশোধনযোগ্য মনে করার দৃঢ় বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত।
নিম্নবর্গের মানুষ তাদের রাজনীতিকে বড় কোনো আদর্শিক ভাষায় প্রকাশ করে না অর্থাৎ তারা সরাসরি ক্ষমতার ভাষায় কথা না বললেও তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগ ও অংশগ্রহণ থাকে। তারা রাজনীতিকে দৈনন্দিন জীবন ও মৌলিক চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে বোঝে—যেমন গ্যাস, রাস্তাঘাট, নিরাপত্তার মতো প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে। এই দাবিগুলোই তাদের এজেন্সির বাস্তব রূপ, যার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে নীরব কিন্তু ধারাবাহিক দরকষাকষিতে যুক্ত থাকে। এটি কেবল প্রয়োজনের বিষয় নয়; বরং এটি তাদের এক ধরনের সচেতন পদক্ষেপ, তারা everyday governance এর অংশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—নতুন নেতৃত্ব, নতুন সরকার কি জনমানুষের এই আশা পূরণ করতে পারবে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে মানুষ আবারও আশাহত হবে? এই প্রশ্ন মানুষকে সতর্ক করে রাখে। বাংলাদেশের জনমানুষের আশা সরল আবেগ নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে সচেতন অবস্থানের প্রতিফলন। ইতিহাস যতই কঠিন হোক, বাংলাদেশের জনগণের সাহস ও রেজিলিয়েন্স আগামী দিনে নতুন আশা জাগাবে—মানুষ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে, এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করবে।