বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও পারিবারিক বন্ধনের অপরিসীম গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে বড় হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মানবসমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান এবং তার সদস্যদের প্রতি আমাদের প্রত্যেকেরই গভীর টান রয়েছে। আমাদের সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদ, আনন্দ-বিষাদের মুহূর্তগুলোর একটি বিশাল অংশ জুড়েই থাকে পরিবার। পরিবার একটি ভরসার নাম, আপন নীড়, আশ্রয়স্থল।
অথচ নিষ্পেষণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও যে পরিবারের একটি ভূমিকা আছে, এ সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ নির্যাতনের আঁতুরঘর পরিবার। গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) পরিচালিত “নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪” এ উঠে এসেছে দেশের ৭০ শতাংশ নারীই তাঁর জীবদ্দশায় স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যেখানে জরিপকালীন সময়ের ঠিক আগের এক বছরে এই হার ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ বছরে প্রায় অর্ধেক নারী তাঁর স্বামীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন।
নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৩২২ জন নারী ও কন্যা শিশুর, যার মধ্যে হত্যার শিকার ২০৮ জন ও আত্মহত্যা করেছেন ১১৪ জন। এর মধ্যে ১৩৩টি হত্যাকাণ্ড স্বামীর, ৪২টি স্বামীর পরিবারের সদস্যের এবং ৩৩টি জন্মগত পরিবারের সদস্যের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। আসকের তথ্যমতে, একই সময়ে গত বছরের তুলনায় পারিবারিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও সামাজিক আন্দোলন সত্ত্বেও কেন আমাদের এখনও এরকম ভয়াবহ পরিসংখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়, সে প্রশ্নে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও বিচারহীনতা যেমন একটি প্রধান নিয়ামক, তেমনি পরিবারকে নির্বিচারে একটি সুরক্ষাদানকারী, কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা এবং যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও দায় রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত লক্ষ্য থেকে যথেষ্ট দূরে থাকার পরেও দিন দিন মোটাদাগে বেড়েছে। কিন্তু সমাজে বিদ্যমান জেন্ডার প্রথাগুলো এত গভীরভাবে প্রোথিত যে একটি শিশুও বাল্যকালেই জেনে যায় নারীদের প্রধান দায়িত্ব ঘর সামলানো এবং সন্তান জন্মদান ও লালনসহ পুনরুৎপাদনশীল কাজগুলো সম্পাদন করা। ফলে একজন নারীর সামাজিক মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় তাঁর কেমন ভালো বিয়ে হয়েছে, সন্তান প্রতিপালনে তিনি কতটা পারদর্শী, সর্বোপরি একটি “সুখী সংসার” গঠনে তাঁর “গুণ” কতটা।
একজন নারী তখনই একটি নির্যাতনমূলক সম্পর্কের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারেন যখন সেই সম্পর্ক থেকে তাঁর বের হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের সমাজে নারীর মূল্যায়ন যেহেতু মূলত সংসারে তাঁর অবদানের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু নারী নিজেও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে অনাগ্রহী থাকেন এবং তাঁর জন্মগত পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও তাকে বিচ্ছেদের ব্যাপারে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত করেন। এখানে পরিবারকে নারীর সুরক্ষাদানের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গণ্য করাও একটি কারণ।
ফলশ্রুতিতে অনেক নারী নিয়ত নির্যাতন সত্ত্বেও নিপীড়নমূলক বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং সহিংসতাকে জীবনের স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবে মেনে নেন, অর্থাৎ আত্তীকরণ করেন। “নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪” এর তথ্যমতে, স্নাতক ও তার ওপরের ডিগ্রিধারী নারী এবং কোনোরূপ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা নারীর জরিপকালীন সময়ের ঠিক আগের এক বছরে সহিসংসতার অভিজ্ঞতায় কোনো তফাত নেই। প্রায় একই চিত্র দেখা যায় ধনী এবং দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রেও। এই পরিসংখ্যানগুলো ইঙ্গিত দেয়, অনেক সময় পর্যাপ্ত শিক্ষা ও সম্পদ থাকার পরেও নারী যেভাবেই হোক সংসার টিকিয়ে রাখাকে প্রাধান্য দিয়ে নিপীড়নমূলক বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকেন।
এ বিষয়ে একই জরিপে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান হচ্ছে ৬৪ শতাংশ নারীই স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হবার কথা কাউকে বলেন না। নারীর এই চুপ করে থাকার পেছনে অনেকগুলো কারণের একটি পরিবারের সুনাম রক্ষা করা। পরিবারের সুনামের সাথে নারীর নিজের মর্যাদা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিধায় নির্যাতনের কথা নারী নিজের মধ্যেই চেপে রাখেন। এই বিষয়টি শুধু স্বামীর দ্বারা নয়, বরং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা সহিংসতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারী শিখেছেন পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতিত হবার কথা প্রকাশিত হলে পারিবারিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। মূলত পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের কাছ থেকেই এই শিক্ষা তাঁরা লাভ করেন। তাই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েও পরিবারের সম্মান রক্ষার ধারক-বাহক হয়ে ওঠেন নারী, তাঁর ব্যক্তিসত্তা ও অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত ও ক্ষতিকর জেন্ডার প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনসহ প্রয়োজন পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি নারীর স্বতন্ত্র, ব্যক্তিগত পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া। গবেষণা বলে, নারীর আয়ত্তে যখন বস্তুগত (যেমন: অর্থ, সম্পত্তি) ও মানবিক (যেমন: শিক্ষা, দক্ষতা) রসদের সাথে সাথে সামাজিক রসদ যেমন সহায়ক সামাজিক বলয় (সুবিবেচক জন্মগত পরিবার, বন্ধু, জনসমাজ) থাকে তখন তিনি নিপীড়নমূলক সম্পর্কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ও প্রয়োজনে বিচ্ছেদে উৎসাহিত হন। পারিবারিক পরিচয়ের বাইরেও নিজস্ব একটি পরিচয়ে নারী যখন মর্যাদাপ্রাপ্ত হন, তখন সহিংসতার আত্তীকরণ ও যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখা থেকে তিনি বিরত থাকেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকেও একই শিক্ষা দেন।
পরিবার নিয়ে বিষোদগার করা কিংবা বাছবিচারহীনভাবে পরিবারকে নারীদের জন্য একটি ক্ষতিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিকাশে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ব্যক্তি নারীকে কেবলমাত্র পারিবারিক পরিচয়ে আবদ্ধ করা এবং যে করেই হোক না কেন, পরিবার রক্ষা করার মানসিকতা জিইয়ে রাখার মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আমাদের প্রত্যেকের উচিত সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীর জন্য একটি সহায়ক সামাজিক বলয় নির্মাণে ভূমিকা রাখা, যাতে প্রতিটি সহিংসতার ঘটনার বিপক্ষে নারী প্রতিবাদ করায় উদ্বুদ্ধ হন। এর পাশাপাশি নারীকে তাঁর আপন পরিচয়ে মূল্যায়ন করার দৃষ্টিভঙ্গি লালন করাও এখন সময়ের দাবি। আমাদের পরিবারগুলো নারীর জন্য নিরাপদ এবং ব্যক্তিগত ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠুক, এটি যেমন আকাঙ্ক্ষিত, তেমনি নিষ্পেষণের কারখানা হয়ে ওঠা পরিবারগুলো থেকে নারীর মুক্তি হোক, সেটিও সমানভাবেই কাম্য।