ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ—ঘরমুখো মানুষের ঢল, শহরের ফাঁকা রাস্তা, কর্মব্যস্ততা থেকে একটুখানি মুক্তি। কিন্তু এই ছুটির আনন্দ শহরের সব শ্রেণির মানুষের জীবনে একরকম নয়। ঈদুল আযহা উপলক্ষে এবারে টানা দশ দিনের সরকারি ছুটি ছিল। এর সঙ্গে স্কুল–কলেজের গ্রীষ্মকালীন ছুটি যোগ হয়ে ছুটির সময়টা আরও লম্বা হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ এই সুযোগে পরিবার–পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে ঢাকার বাইরে গেছেন। কিন্তু এ আনন্দে সবার ভাগ নেই; শহর ফাঁকা হলেও একদল মানুষ রয়ে গেছেন ঢাকাতেই—চা দোকানি, রিকশাচালক, দিনমজুর, ডেলিভারিম্যান, কসাই, মুদি দোকানি, ফল–সবজির দোকানদার—যাদের পক্ষে গ্রামে ফেরা সম্ভব হয়নি। কারণ লম্বা ছুটিতে ঘরে ফেরা মানেই তাদের আয়ের ক্ষতি, বাড়তি খরচের চাপ আর ধারদেনা করে কাটানো দিন। এছাড়া অনেকেই সপরিবারে ঢাকা চলে এসেছেন দশ থেকে পনেরো বছর আগে, গ্রামে তাদের ঘর–বাড়ি বা পরিবার–পরিজন কেউ নেই। এই মানুষগুলোর জীবনের বাস্তবতাকে বুঝতে আমরা BIGD-এর পক্ষ থেকে মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার ও চাঁদ উদ্যান এলাকায় সরেজমিনে কথা বলেছি কয়েকজন নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে।
শহরের রিকশাচালকেরা ছুটির শুরু থেকেই তীব্র মন্দার মধ্য দিয়ে গেছেন। শহরে মানুষ না থাকায় যাত্রী নেই, আয় কমে গেছে। রিকশার গ্যারেজগুলোতে দেখতে পেলাম সারি সারি রিকশা দাঁড়িয়ে, চালকেরা আর রাস্তায় বের হচ্ছেন না। একজন রিকশাচালক বললেন: “আগে দিনে ১,০০০–১,২০০ টাকা হইতো, এখন ৪০০–৫০০ টাকার জন্যে সারাদিন রাস্তায় ঘুইরা মরতে হয়। তার মধ্যে ৪০০ টাকা জমা দিয়ে দিতে হয়। তাই বাইর হইতেছি না।” আরেকজন বলেন: “ঈদের পরের দিন ব্যাটারি রিকশা নিয়ে বাইর হইছিলাম, পুলিশ রাইখা দিছে। ৩,০০০ টাকা দিয়া ছাড়াইয়া আনতে হইবো। হাতে এহন টাকা নাই, যার কাছ থেইকা ধার নেই তার কাছেও টাকা নাই। টাকা হইলে ছাড়াইয়া আনমু।” এছাড়া চরম অসুবিধায় পড়েছেন ব্যাংকনির্ভর শ্রমিক ও ঠিকাদারেরাও। ওয়াসার একজন ঠিকাদার জানান: “ঈদের আগেই টাকা দরকার ছিল, কিন্তু ব্যাংক বন্ধ থাকায় টাকা তোলা যায় নাই। কাজ শুরু করতেও দেরি হইতেছে।” একজন দিনমজুর বলেন: “ঈদের চার দিনের বাড়তি ছুটিতে যেন এক মাস পিছাইয়া গেলাম।” একজন বেকারি ডেলিভারিম্যান বলেন: “চব্বিশটা দোকানে মাল দেই, এখন মাত্র নয়টা খোলা। বাকি দোকানদাররা এখনও আসে নাই দেশের বাড়ি থেইকা। ডেলিভারির উপর আমি কমিশন পাই। চলতি মাসে সঞ্চয় ভাইঙ্গা চলতেছি।” এইসব গল্প একত্রে দেখায় ঈদের দীর্ঘ ছুটি নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে কীভাবে অনিশ্চয়তা, ব্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝা বয়ে আনে।
কোরবানির সময় এ চাপ আরও বেশি অনুভব হয়, যখন অনেকেই মাংস পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে এবছর সামগ্রিকভাবে কোরবানির পরিমাণ কমে গিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, গত বছরের তুলনায় তেরো লক্ষ পশু কম কোরবানি করা হয়েছে (প্রথম আলো, ১১ জুন)। এর পাশাপাশি হ্রাস পেয়েছে কোরবানির মাংস পাওয়ার মতো সামাজিক সুযোগও। ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় অংশ নেওয়া অনেকে জানিয়েছেন এইবার কোনো বাড়িওয়ালা বা পাড়া–প্রতিবেশী কোরবানির মাংস দেয়নি। অনেকে লজ্জায় চাইতেও পারেননি। ঈদের কর্মহীনতার মধ্যে পূর্বের বছরগুলোতে একই এলাকার কয়েকজন মিলে কোরবানির পশু বানানোর (মাংস কাটা) কাজ করতেন। কাজশেষে পারিশ্রমিকের পাশাপাশি কিছু পরিমাণ মাংস পেতেন, যা দিয়ে অন্তত একবেলা পরিবারের সবাই ভাত খেতে পারতেন। তবে এবার তারা মাংস পাননি, আবার পারিশ্রমিকও গত বছরের তুলনায় বাড়েনি। একজন চা দোকানি বলেন: “ঈদের দিন দোকান বন্ধ রাইখা পাঁচ জন মিইল্যা গরু বানাইতে গেছিলাম। ঈদের আগে মসজিদে হুজুররা গরু বানায় যারা তাগো গোশত না দেওয়ার ফতোয়া দিছে। গরু বানাইয়া যেই টাকা ভাগে পাইছি, তা দিয়া এক কেজি গোশতও কিনবার পারি নাই।” বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল যে, হুজুরদের এমন ফতোয়া দেওয়ার পেছনের কারণ হলো, যেহেতু এই মানুষগুলো পেশাদার কসাই নন, তাই অনেকে পারিশ্রমিকের পরিবর্তে কোরবানির কিছু মাংস দিয়ে দেন। তাদের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতেই এমন ফতোয়া। অথচ ফল হলো ঠিক তার উল্টো—তারা না পেয়েছেন ন্যায্য পারিশ্রমিক, না পেয়েছেন কোরবানির মাংস। তবে কিছু ভিন্ন অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে, যেখানে ঈদের সময়টাতেই কেউ কেউ নিজেদের মতো করে সুবিধা খুঁজে পেয়েছেন।
একজন চা দোকানি বলেন: “ঈদের দিনে দোকান খোলা রাখায় বিক্রি বাড়ছে। কারণ পাশের দোকানগুলো বন্ধ ছিল। যারা ঢাকা ছিল, তারাই আসছে।” একজন ফুড ডেলিভারিম্যান জানান: “ঈদে অর্ডার কমেছে ঠিকই, কিন্তু যারা দিয়েছে তারা বড় অর্ডার করেছে।” অবস্থা এমন নয় যে সবাই কেবল ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যারা কিছুটা স্বচ্ছল—যেমন মৌসুমি ফল বিক্রেতা কিংবা নিজের দোকান চালানো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের ওপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে বিক্রি বাড়লেও অনেকেই জানালেন দোকানের আয় বাড়েনি, কারণ ছুটির সময়টায় বেশি বাকি দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, যারা দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য লম্বা ছুটি মানেই অনিশ্চয়তা, ক্ষয়ক্ষতি ও হতাশা। একজন রংমিস্ত্রি বলেন: “অন্যবার ঈদের দুই থেকে তিন দিন পরেই কাজ পাইয়া যাইতাম। এইবার তো এখনও কিছু শুরু হয় নাই। ধার কইরা চলতেছি। কবে এই ঋণ কাটাবো কে জানে!” অর্থাৎ লম্বা ছুটির পর অর্থনীতির চাকা সচল হতেও সময় লাগে, আর এই সময়টুকুই নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে তৈরি করে বাড়তি চাপ।
একই শহরে বসবাস করলেও ঈদের অভিজ্ঞতা যে শ্রেণি ও পেশাভেদে কতোটা ভিন্ন হতে পারে, তা স্পষ্ট বোঝা যায় এই সাক্ষাৎকারগুলো থেকে। ছুটি নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাসের মাঝেও শহরের দরিদ্র মানুষের জীবনের বাস্তবতা আমাদের ভাবাচ্ছে। কারণ ছুটি সবার জন্য অবসর নয়, বরং বেকার হয়ে পড়া, ধারদেনা করা এবং আগামী তিন–চার মাসে এই দেনা পরিশোধের বাড়তি চাপের মুখোমুখি হওয়া।
সবশেষে, প্রশ্ন থেকেই যায়—ঈদের আনন্দ কি শুধুই যারা ছুটি নিয়ে ঘরে ফেরেন সেই মানুষদের জন্য? নাকি শহরের অলিতে–গলিতে থাকা এই নিম্ন আয়ের মানুষেরও তার অংশ হওয়া উচিত? ভবিষ্যতের ছুটি পরিকল্পনায় এসব জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবিও অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি—যাতে উৎসব সবার হয়, কারও জন্য ভার হয়ে না আসে।
